Bangladesh United Students of Economics-BUSE

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

Monday, February 4, 2019

জলাভূমি বাঁচলে, বাঁচবে বাংলাদেশ

মোঃ মেহেদী হাসানঃ
২ ফেব্রুয়ারি ছিল বিশ্ব জলাভূমি দিবস। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে ইরানের রামসার নগরীতে জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য বিশ্বের ৯৩টি দেশ মিলে একটি বহুজাতিক সনদে স্বাক্ষর কর’ যা সারা বিশ্বে ‘Ramsar Convention on Wetlands of International Importance Especially as Waterfowl Habitat’ বা সংক্ষেপে ‘রামসার সনদ’ নামে অধিক পরিচিত।

বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষর করে ১৯৯২ সালের ২০শে এপ্রিল। বহুবিধ প্রক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া শেষে ১৯৯৭ সালে রামসার সনদের আওতায় নেত্রকোনায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সেন্টার ফর এডভান্স রিচার্স ইন ন্যাচারাল রিসোর্সেস এণ্ড ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি জলাভূমি গবেষণা ও শিক্ষাকেন্দ্র। বাংলাদেশের সুন্দরবনের ১৪,৮৭,০০০ একর এবং টাঙ্গুয়ার হাওরের ২৩,০০০ একর জলভূমিকে আন্তর্জাতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০০০ সালের দিকেই।

এবারের বিশ্ব জলাভূমি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, “জলাভূমি ও জলবায়ু পরিবর্তন”। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গত একযুগের যে বড় দুটি ঘূর্ণিঝড় তথা ১৫ই নভেম্বর ২০০৭ সালে সিডর এবং ২৫শে মে ২০০৯ সালে আইলা তীব্র আঘাত এনেছিল তার অনেকাংশই থামিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের ব-দ্বীপের প্রাকৃতিক প্রহরী সুন্দরবন । ফলে যত ভয়ংকর ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশংক্ষা ছিল তা বহুলাংশে কম হয়েছিল। শুধু সুন্দরবনই বাংলাদেশকে জলবায়ুর পরিবর্তনের আগ্রাস থেকে ঠেকিয়ে রাখছে এমনটা নয়, বরং দেশের উত্তর-পূর্ব হাওর অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বের জলাভূমি অঞ্চল এবং পশ্চিম-উত্তরের ও মধ্যভাগের কিছু ছোট নদ-নদী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করছে।

কিন্তু, এতদসত্ত্বেও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষ সৃষ্ট কিছু কারণে আজ বাংলাদেশের এই সদা জাগ্রত প্রাকৃতিক প্রহরীগুলো একে একে ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, গত ১৫ই এপ্রিল ২০১৭ থেকে ২৫শে এপ্রিল ২০১৭, এই ১০ দিনে উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় থেকে আসা কয়লাখনি, চুনাপাথর খনি, ইউরেনিয়াম খনির পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে ছোট-বড় মোট ৬০০টি হাওয়রে ৫০মেট্রিক টন মাছে মারা গেছে, লাখ লাখ জলজ প্রাণী মারা গেছে, মৌলভীবাজারের হাকালুকিতে ২৫ মেট্রিক টন মাছ মারা গিয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের দল সুনামগঞ্জ পরিদর্শন করে এসবের কারণ হিসেবে– (১) পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়া (২) অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে যাওয়া (৩) অ্যাসিডিটির ও কীটনাশক এই চার কারণ দর্শিয়েছেন এবং মৎস অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে পানির পিএইচ মাত্রা(এসিড ভারসাম্য) ৭ এর উপরে থাকার কথা সেখানে ৪.৫ এবং ৪.৪ পিএইচ পাওয়া গেছে যা অতিরিক্ত মাত্রার এসিড।

অথচ, বাংলাদেশের বাচ্চা শ্রেণীর ছেলে মেয়েরাও জানে বাংলাদেশে অনেক বন্যায় ২০-২৫ দিন পানি থাকার পরও ফসল নষ্ট হয় বটে, কিন্তু সেটা ৭৫ মেট্রিক টন মাছ নষ্ট করে না বা লাখ লাখ জলজ নির্ভর প্রাণী মারে না , বরং উল্টো বন্যার সময় মাছ বৃদ্ধি পায় সর্বত্র।

এখন, অনেকের যুক্তি হতে পারে হাওর এলাকা বদ্ধ , এখানকার ইকোসিস্টেম আর বাকি বাংলাদেশের ইকোসিস্টেম এক নয়, কিন্তু জেনে অবাক হবেন, ২০১৭ এর এপ্রিল শুধু নয় ২০০৭ সালে মাটিয়ান হাওর ও শনির হাওর ; ২০০৮ সনেও সেই খানে একই সমস্যা দেখা দেয় ।এলাকাবাসী বারংবার উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে অপরিকল্পিত নানান খনির বিষয়ে অভিযোগ করলেও, সরকার ও তথাকথিত পরিবেশ সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কথা ও ব্যাখ্যায় বিষয়টি এড়িয়ে গেছে, অথচ ভারতের উত্তর-পূর্ব পরিবেশবাদী ও আদিবাসী সংগঠনগুলো মাঠে নেমে আন্দোলন করেছে এবং করছে।

উল্লেখ্য, রামসার এবং আন্তর্জাতিক প্রাণ বৈচিত্র সনদে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই স্বাক্ষর করে যা টিপাইমুখ প্রসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে কার্যকরী করা যায়।

আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র সনদের (Convention on Biological Diversity) CBD, ১৯৯২ ১৪নং অনুচ্ছেদের ‘ঘ’ ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে, ‘চুক্তিবদ্ধ পক্ষরাষ্ট্রের আওতাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সৃষ্ট কোনো কারণে যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রাণ বৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে তবে সম্ভাব্য ক্ষতির শিকার সে রাষ্ট্রকে তা অভিহিত করতে হবে এবং ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে’।

এছাড়াও রামসার সনদের ৫নং অনুচ্ছেদ উল্লেখ আছে, চুক্তিবদ্ধ পক্ষ রাষ্ট্রসমূহ রামসার সম্মেলন থেকে উদ্ভুত দায়-দায়িত্ব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যা একাধিক রাষ্ট্রের ভৌগলিক সীমানা জুড়ে বিস্তৃত এবং যেসব জলপ্রণালী এক বা একাধিক রাষ্ট্র ব্যবহার করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলো জলাভূমি এবং জলাভূমির উদ্ভিদ ও প্রাণীকূল সংরক্ষণের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা ও বিধান বাস্তবায়ন করবে। আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় এসব চুক্তি ও সনদের গুরুত্ব উপেক্ষা করে যদি আগ্রাসী মনোভাবের প্রতিবেশী রাষ্ট্র পোষণ করতেই থাকে , তাহলে অচিরেই বাংলাদেশের জলাভূমিগুলো অতীতের চেয়ে আরও ভয়ানক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়তে পারে।

এছাড়াও অভ্যন্তরীণ কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ব্যবহার মাত্রা নির্ধারণকরণ, কলকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, দলখকৃত জলাভূমি উদ্ধার করণ, নদ-নদী ও হাওরের নাব্যতা নির্দিষ্টকরণ, পানির অম্লত্ব ও অক্সিজেন মিশ্রণ সর্বদা পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন, যা সরকারি ও বেসরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল অঙ্গ-সংগঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়।
জাতি হিসেবে আগের নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ ইকোসিস্টেম তথা প্রাকৃতিক পরিবেশকে শক্তিশালী ভূমিকায় দাঁড় করতে পারলে, আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তনকে সম্মিলিত ভাবে কিছুটা হলে প্রশমিত করা যাবে এবং একটা মসৃণ জলবায়ু পরিবর্তনও সম্ভবপর হতে পারে যদি আমরা আগে আমাদের দেশের ‘প্রাকৃতিক প্রহরী’ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জলাভূমিকে রক্ষা করতে পারি।
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রথম প্রকাশ ; ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ Northbengal24.net
ব্লগে পুনঃপ্রকাশ; ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
  • 0Blogger Comment
  • Facebook Comment

Post a Comment