Bangladesh United Students of Economics-BUSE

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

Sunday, June 23, 2019

শিশু-শ্রমে ভবিষ্যৎ বিক্রি : প্রসঙ্গে শিল্পায়ন ও উত্তরবঙ্গ

মোঃ মেহেদী হাসানঃ-

গত ঈদে ৭ই জুন ঠাকুরগাঁও জেলা "শিক্ষা সম্মেলন-২০১৯" আয়োজন শেষ করে এক টেক্সটাইল অফিসার বন্ধুকে তার কারখানার গাড়িতে তুলতে গিয়ে দেখি, কাচা বয়সের এক মেয়ে স্যার স্যার করে বন্ধুকে ডাকছে। মেয়ের বাবা ওখানে মেয়েকে কারখানার গাড়িতে তুলে দিতে আসেছিল। তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার মেয়ের বয়স কত? মেয়ের বয়স ঠিক বলতে পারে না, তবে স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পড়া অবস্থায় কয়েক মাস হল ঢাকা শহরে গিয়ে টেক্সটাইল কারখানায় কাজ শুরু করেছে। মেয়ের বাবাকে বললাম, " আপনি এই ছোট মেয়েকে ভাল একটা শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষা না দিয়ে এপথে পাঠালেন কেন? আপনি কিছু করেন না? " মাথা নিচু করে লোকটি বলেছি, "ওর নাকি ঢাকায় কাজ করতে ভাল লাগে তাই গেছে, আমি তো বাসায় ছোট খাটো কৃষি কাজ করি"।
অফিসার বন্ধুকে বললাম, এমন কতগুলো বাচ্চা ছেলে মেয়ে লেখাপড়া ছেড়ে ঢাকায় কাজ করতে যায়? তার তথ্য ভয়ংকর! প্রতি ঈদে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা থেকে বহু টেক্সটাইল- গার্মেন্টস কর্মীদের গাড়ি আসে যাদের আনুমানিক ৩৫-৪০ শতাংশ কম বয়সী বাচ্চা ছেলে মেয়ে যারা লেখাপড়া ছেড়ে অর্থের লোভে বা অভাবের তাড়নায় ঢাকায় গিয়ে কাজ করে।


শিক্ষা সম্মেলনে তো অনেক অতিথি, অনেক নেতা,এমনকি আয়োজক সংগঠনের পক্ষ থেকে অনেকেই নির্দিষ্ট এজেণ্ডা ছাড়াই মাইক হাতে অনেক কিছুই বলে গেলেন, কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেউ কিছু বলেন নাই। আর আমরা যদি আমাদের নিজেদের evaluation না করি, তাহলে আমাদের তথা উত্তরবঙ্গের সমস্যা অন্য কেউ এসে সমাধান করবে না।

বাংলাদেশের শিল্প বিকাশের সাথে সাথে একটা শ্রেনীকে সিস্টেমে এই শিল্পকারখানায় অল্প মজুরির শ্রমিক বানিয়ে রাখা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের কৃষি প্রধান এলাকাগুলোকে এইসব অল্প মজুরির শ্রমিক supply এলাকা হিসেবে গুরুত্ব পায়। কৃষি কাজ থেকে অতিরিক্ত শ্রমিক যদি শহরের কারখানায় কাজ করে, তাহলে নিঃসন্দেহে এটা উত্তরবঙ্গের জন্য ভাল হবে, সবার জন্য কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু, যদি বাচ্চা ছেলে মেয়েরা যদি লেখাপড়া ছেড়ে শহরে অভাবে বা টাকার নেশায় পাড়ি জমায়, তাহলে কোনমতেই উত্তরবঙ্গের ভবিষ্যৎ 'কৃষিভিত্তিক' নয়, সস্তা দরের 'লেবার-বঙ্গে' পরিণত করতে বাধ্য।
অামার লেখাটা উত্তরবঙ্গ কেন্দ্রিক কিন্তু এটা সারা বাংলাদেশের সমস্যা। বাংলাদেশে শিশু শ্রম আইন আছে, তার শাস্তিও অাছে; কিন্তু নেই শুধু সেই আইনের বাস্তবায়ন। একটা সুষ্ঠু, ন্যায্য শ্রমিক আইনও নেই।

তাহলে, এই সমস্যার সমাধান কি হতে পারে?
এই সমস্যার সমাধান করতে গেলে দেশের বড় বড় সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যেতে পারে, যদি রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সচেতনতাবোধ আমাদের নেতৃস্থানীয় ও সমাজসেবীদের মাঝে জন্ম নেয়।

প্রথমত, শিশু শ্রম বন্ধ করতে হলে আগে School drop out বা ঝরে পড়া শিশু কিশোরদের ও তাদের পরিবার সনাক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত,অর্থনৈতিক প্রলোভন নাকি নিতান্তই চরম দারিদ্র্যতায় লেখাপড়া ছাড়ছে সেটা খতিয়ে দেখা।
অর্থনৈতিক ভাবে চরম দারিদ্র্যতায় পতিত হলে, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে চাল, ডাল ও পারিবারিক ভাবে প্রাপ্তবয়স্ক একজন কে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত,জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক সাপেক্ষে কলকারখানায় চাকুরির বিধান করা ; অন্যথায় কারখানার মালিক ও পিতামাতার বিরুদ্ধে অাইনী ব্যবস্থা নেওয়া।
চতুর্থত,উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক না করা পর্যন্ত শিশু শ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

পঞ্চমত,শিল্প কারখানার ঢাকা শহর থেকে বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। এখন উত্তরবঙ্গ সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত ভাল। এখন যা প্রয়োজন তা হলো ঐসব এলাকায় বিনিয়োগকারী এবং তাদের সরকারি নির্দেশনা ও ট্যাক্স ছাড় অথবা ভর্তুকি বা অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে incentives.
এছাড়াও,কলকারখানার জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়, যদি সরকার একটু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দিকে হাঁটেন।


পরিশেষে বলবো, বাংলাদেশ বর্তমানে যে হারে শিল্পায়নের পথে হাঁটছে, সেই তালের সাথে যদি এদেশের মানব সম্পদের উন্নয়ন না হয়, তাহলে এই শিল্পায়নের সুফল সবাই সমহারে পাবে না ; ধনী-গরিব বৈষম্যের মোটা দেয়ালে আমরা বিশেষত লেখাপড়া ছেড়ে অাসা এই অদক্ষ শিশু শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ বিভক্ত হয়ে পড়বে।
শিশু-শ্রম সংক্রান্ত বেশি বেশি অধ্যয়ন ও গবেষণা এখন সময়ের দাবি ও নিরাপদ, দক্ষ মানব সম্পদশালী ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন।

লেখকঃ গবেষক ও সমাজসেবক কর্মী
  • 0Blogger Comment
  • Facebook Comment

Post a Comment