জেরিন আক্তার
যদি বাঙালি জাতি সত্ত্বা গঠনের ৫০০০ বছরের পুরনো লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট খুঁজতে হয়, তাহলে এই বাংলায় আর্যদের আগমনের পূর্বে যেসব কোল, মুন্ডা বা সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বসবাস করত তাদের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট খুঁজতে অবশ্যই উত্তরবঙ্গের গ্রাম-বাংলায় আসতেই হবে।
এই লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সংরক্ষণের স্বল্প পরিসরে কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিলেন ২০০৬ সালে ড.মুহাম্মদ শহীদ উজ- জামান। ঠাকুরগাঁও
জেলা সদর হতে ৩ কি.মি উত্তরে আচকা ইউনিয়নে জাদুঘর টি অবস্থিত। অন্য সব
জাদুঘর এর চেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী এ জাদুঘরটি। ঠাকুরগাঁও জেলার ৮০% মানুষ
কৃষি ও অন্য শ্রমজীবী পেশায় নিয়োজিত। এ অঞ্চলে রয়েছে সাঁওতাল ক্ষুদ্র
জাতিগোষ্ঠী। বিশেষত এই শ্রমজীবী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী জনজীবনকে কেন্দ্র করে
এ জাদুঘর টি প্রতিষ্ঠান করেন।
বাংলাদেশের
হিংস ভাগ কৃষি পণ্য উৎপন্ন হয় উত্তরাঞ্চলে।সময় এর সাথে ফসল উৎপাদন এর
পদ্ধতি ও যন্ত্র পাতি পরিবর্তন হয়েছে ঠিক'ই কিন্তুু কৃষি পণ্য উৎপাদন এর
দেশিও কিছু যন্ত্রপাতি ছিলো যা আজ বিলুপ্ত প্রায়। হয়তো বর্তমান প্রজন্মের
অনেকেই দেখা তো দূরের কথ নামই শুনেনি। এছাড়া আমাদের সংস্কৃতির গান-বাজনারও নিজস্ব যন্ত্রপাতি রয়েছে যা বিলুপ্ত প্রায়।
প্রতিটি সভ্যতা, গ্রাম, শহর গড়ে ওঠার পিছনে রয়েছে নদীর ভুমিকা অপরিসীম। এসব নদীর অনেক গুলোই মৃত বা মানচিত্র হতে হারিয়ে গিয়েছে। লোকায়ন
জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘরটি বিলুপ্ত প্রায় কৃষি যন্ত্রপাতি, গানবাজনা যন্ত্র
ও বিলুপ্ত প্রায় ও বিলুপ্তি নদীর নাম ও পানি সংগ্রহ করে দেশীয় ইতিহাস ও
এতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে।
এছাড়াও মুক্তি যুদ্ধ গ্যালারিও রয়েছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন বদ্ধ ভুমির মাটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
পাখি কলোরব ও গাছপালায় আচ্ছন্ন এ জাদুঘর টিতে প্রায় ৭০ প্রজাতির ফল গাছ ও ১২০ প্রজাতির ঔষধি গাছ রয়েছে।
গেট দিয়ে ঢুকতেই একটি লেক, লেক এর উপর বাঁশের সাঁকো যা প্রকৃত গ্রামবাংলার রূপ ধারণ করে আছে। বসার জন্য গাছের গুড়ির চেয়ার রয়েছে। গ্যালারি গুলোর পাশেই পালকি রয়েছে যাতে করে আগে গ্রামে বিয়ের কনে নিয়ে আসা হতো, তারও পাশে রয়েছে গরুরগাড়ি যা যানবাহনে প্রধান মাধ্যম।
এ জাদুঘর এর গেট এ ঢুকলেই বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর পৃথিবীর দুষিত বাসাতের মাঝে একটুকরো সজীব গ্রামবাংলার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
৫টি গ্যালারি রয়েছে।
১.নদী গ্যালারি
২.সমতল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গ্যালারি
৩.মিউজিক
৪.তৃণমূল লোকজ গ্যালারি
৫.মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি
নদী গ্যালারি
বাংলাদেশ
সহ পৃথিবীর বিভিন্ন নদ-নদীর নাম ও পানি সংরক্ষণ করে রাখা হয়ে কাচের জার এ।
যে নদী গুলো একসময় ছিলো খরস্রোতা ও অনাবিল ছুটে চলা ছিল যার
লক্ষ্য তাই
অধিকাংশ আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে বা মৃত প্রায় আর এসব নদীতে মাঝি পাল
তোলে না, মাছ মারে না জেলে। এসব হারিয়ে যাওয়ার পিছনে আমরাই কোন না কোন ভাবে
দায়ী। তাই লোকায়ন জাদুঘর এসব নদীর নাম সংরক্ষণ করে রেখেছে নদী না থাকলেও
এর নাম যেন জানতে পারে পরবর্তী প্রজন্ম।
নদীগুলোর নাম হলো:দানিউব, মর্মর, লাচ্ছি, খুনিয়া দিঘি,শুক, ডাহুক, করতোয়া, ছাতনাই,চেংমারি, তীরনই,ভুল্লী নদী,কুলিক,টাংগন,মহানন্দা,
নীল নদ,জর্ডান সী আরো অনেক নদীর নাম। এর সাথে বাংলাদেশের নদী ম্যাপ এর নকশাও রয়েছে।

এছাড়াও, নদীমাত্রিক এই বাংলায় মাছে-ভাতে বাঙালির সংস্কৃতির ধারকবাহক হল- মাছ শিকার।
ফসল যখন বন্যায় গ্রাস করে তখন সেই আগ্রাসী নদীর বুকেই আগ্রাসন চালিয়ে মুখের গ্রাসের অন্বেষণ করাই বাঙালির আরেক বৈচিত্র্যময় জীবনসংগ্রামের বৈশিষ্ট্য ।
এছাড়াও
এ গ্যালারিতে বিলুপ্ত প্রায় অনেক মাছ এর ছবি সহ নাম রয়েছে।যেমন, সরপুঁটি
মাছ,হুতুম, রাণী, বেলে,বাতাসি, কাকিলা,চান্দা, কুইচ্ছা ইত্যাদি সব মাছের
নাম।
এর সাথে রয়েছে মাছ ধরবার দেশীয় যন্ত্রপাতি বর্শা,কোচ,কোচা,ঝোকা ইত্যাদি।
এই গ্যালারিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলোর একটি বিশাল মানচিত্র অঙ্কন করা রয়েছে।
দর্শনার্থীরা এখান থেকেই কিছুটা হলেও সংরক্ষিত নদ-নদীর পানির উৎস ও নদ-নদীগুলোর গতিমুখ তথা অবস্থান থেকে জানতে পারবে।
সমতল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠ
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর
ব্যবহার্য জিনিসপত্র ঠাঁই পেয়েছে এতে। দড়ি তৈরী করার ঢেঁড়া, ধান রাখার ডেলি
বা ধামা,কুল,শীতল পাটি,বদনা, মুরালি বাঁশি, বানকা যা দিয়ে ফসল আনা হতো,কারমা ঠিলি মদ রাখার পাত্র,ধুক্কা, তীর ধনু
ক, ইত্যাদি জিনিস পত্র। সাঁওতাল এ অঞ্চলের প্রধান নৃ জাতিগোষ্ঠী। তাঁদের জীবন যাত্রার ধরন যদিও বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলে মিশে গেছে। কিন্তুু আগে তাদের জীবন ব্যবস্থা আলাদা ছিলো
তীর দিয়ে বন্য পশু শিকার, তিন চার দিন বাসি ভাত মাটিতে পুতে রেখে দেশীয় মদ বানিয়ে কারমা ঠিলায় রেখে বিশেষ উৎসব এ পান করতো। তাঁরা মাটির ঘরে থাকতো
শীতলপাটি বিছিয়ে। ঢেঁড়া দিয়ে দড়ি পাকাতে পাকাতে, তামাক দিয়ে হুকা খেতো।
বিচিত্র তাদের জীবন ব্যবস্থার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে এ গ্যালারিতে।
ধর্মীয় সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশও পরিলক্ষিত হয় বিশেষ করে ইসলামিক ও সনাতন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসগুলো।
এছাড়াও, সাঁওতাল সমাজের ব্যবহৃত নিত্য জিনিসপত্রই এখানকার মূল আকর্ষণ। উত্তরবঙ্গের আবহ কালের সকল রূপের গুঞ্জন এই গ্যালারির পরতে পরতে বিদ্যমান।
মিউজিক গ্যালারি
এখনে বিলুপ্ত প্রায় বাদন যন্ত্রপাতির ঠাই পেয়েছে। যেমনঃ কলেরগান,ক্যাসিড, ভিউগাল, বিউগল, নাকাড়া, বিন, ক্ল্যারিওনেট, জাইলোফোন, ঘন্টা ইত্যাদি । 
প্রাচীন কাল হতে মানুষের বিনোদন এর প্রধান মাধ্যম হলো গান। অনেক সময় গান এর ধরন ও বাদ্য যন্ত্র দ্বারা সংস্কৃতি পৃথক করা যায়। যেমন আমাদের রংপুর অঞ্চলে ভাওয়াইয়া গান অন্যসব অঞ্চলের চেয়ে আলদা।
এছাড়াও, উত্তরবঙ্গয়ের আদিম অধিবাসী সাঁওতালদের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এখানে দেখতে পাওয়া যায়।
আর নতুন বাদ্যযন্ত্রের আভাসে দেশীয় বাদ্যগুলি আজ বিলুপ্তির পথে এবং এদের নাম ও অজানা। এসব সংরক্ষণ এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিজ সংস্কৃতি বিনোদন মাধ্যম গুলোর সম্পর্কে জানা।
তৃণমূল লোকজ গ্যালারি
এখানে
পুরোনো যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্বর মধ্যে বাঘা
মসজিদ এর ইট, পুরোনো রেডিও টেলিভিশন, সুতা কাটার চড়কা,ঢেকি,বিট্রিশ আমলের
পয়সা ও দলিল পত্র,কড়ি,বিভিন্ন খেলনা, হাড়ি পাতিল।
ঠাকুরগাঁও জেলায় বিভিন্ন সময়ে প্রাচীন কাল হতেই জনপদ গড়ে ওঠেছে। তাঁর প্রমাণ বহন করে এসব জিনিস পত্র। এসব জিনিস পত্রের দ্বারা তখনকার শিল্পমনা,কুঠির শিল্পের দ্বারা আন্তনির্ভরশীল সমাজের চিত্র ফুটে ওটে চরকার সংগ্রহ দেখে,এছাড়াও পুজার সামগ্রীর দেখে পুজার ধরন বুঝা যায়, দলিল দেখে তখনকার সমাজের নিয়মকানুনে ও আইন সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
এখনকার জিনিস পত্রে বেশির ভাগ কাঁসার তৈরী তা হতে বুঝা যায় তখন কাঁসার জিনিস এর প্রচলন ছিলো যা আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। কড়ি দ্বারা সাধারণত বেদে দল এর সাথে সম্পর্কিত বুঝায় যা এ অঞ্চলে এখনো দেখা যায়। এসব দ্বারা একটা জনপদ এর ধারাবাহিক সংস্কৃতির চিত্র অঙ্কন করা যায়।
এছাড়াও বিভিন্ন আমলের বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও কাগজী নোটের সমারহ এখানে দেখতে পাওয়া যায়। এসব মুদ্রায় নাম অখ্যাত অনেক শাসক ও তাদের শাসন আমলের সময়কালেরও উল্লেখ্য পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি
এখানে
মুক্তিযুদ্ধচলাকালে বিভিন্ন ঘটনার বর্নণা দেওয়া হয়েছে এবং সারা বাংলাদেশ
এর ১১১ টি বদ্ধ ভুমি হতে মাটি সংগ্রহ করে কাচ এর জার এ রাখা হয়েছে ।
ঠাকুরগাঁও জেলা মুক্তিযুদ্ধের সময় ৬ নং সেক্টরের অধীন ছিলো। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এ অঞ্চলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে তার বণর্না রয়েছে। তাছাড়া এ অঞ্চলের পাশেই রয়েছে ভারত সিমান্ত যার ফলে এ ঠাকুরগাঁও পথে মিত্র বা মিত্র বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করতো বলে জানা যায় ।
এটি
ঠাকুরগাঁও এর অন্যতম দর্শনীয় স্থান। হারানো এতিহ্য এর সন্ধান এর পাশাপাশি
লেকের পানিতে পদ্ম ফুল, বাঁশের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে গোধুলির বেলার দৃশ্য দেখার
মজাই আলাদা। রবীন্দ্র মঞ্চ ও রয়েছে, এখানে বর্ষাবরণ, বসন্তবরণ উৎসব ও হয়ে থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, লোকজ সংস্কৃতি আমাদের সামনে নিত্যদিনের নীরব চলার পথের সঙ্গী যা আমরা অনেকসময় পৃথকভাবে মুল্যায়ন করি না, কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী এই লোকজ সংস্কৃতি'ই আমাদের পরিচয় তুলে ধরবে অত্যন্ত নিঃস্বার্থভাবে; হ্যাঁ! লোকজ সংস্কৃতি'ই আমাদের অস্তিত্বের ঐতিহাসিক দর্পণ হয়ে থাকবে।
জাদুঘর দর্শন এর সময়সুচি
সোমবার হতে শনিবার প্রতিদিন বেলা ৯ টা হতে বিকেল ৫ টা অবধি। প্রবেশ মুল্য ২৫ টাকা মাত্র।
যোগাযোগ এর ব্যবস্থা
ঠাকুরগাঁও জেলা সদর হতে ২০ টা ভাড়ায় অটো বা রিকশায় আসা যায়।
লেখক
জেরিন আক্তার
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদনায় ও সার্বিক সহযোগিতায়
মোঃ মেহেদী হাসান
অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
Post a Comment