লেখকঃ মোঃ মেহেদী হাসান;
একটি দেশের জনসংখ্যা হল সেই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ, ততক্ষণ পর্যন্ত যখন সেই জনসংখ্যার উপযুক্ত উপার্জনক্ষম কাজ-কর্ম তথা উৎপাদন ব্যবস্থার পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। কিন্তু, বাংলাদেশের অবস্থা হয়েছে এমন যে, এখানে অশিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিতরা কোনমতে কল-কারখানা ও কৃষিকে অবম্বনে বেঁচে থাকলেও, উচ্চ শিক্ষিতরা কিন্তু উচ্চমাত্রায় মানের বেকার হয়েই থাকে; আমার মুখের কথা নয়, বরং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ(সিপিডি)এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে আসে এই তথ্য যে বাংলাদেশে শিক্ষার লেভেল যত বাড়ে,বেকারত্বের হারও বাড়ে। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষিতরা উচ্চমানের বেকার হয়ে থাকে এবং বেকার মানেই পরিবার ও দেশের বোঁঝা! এখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বা কোথাও থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে কি সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়ে অনিশ্চিত চাকুরির জন্য রাত দিন অনির্দিষ্টকাল তপস্যা করব আর লবিং-ঘুষ যোগার করব নাকি অন্য কোন নিশ্চিত পরিকল্পনা করব? আবার অনেকেই তো আত্মহত্যার ডিজিটাল পথ বেঁছে নিয়েছেন বেকারত্বের লজ্জায়। আসুন সংখ্যার খেলায় পরিকল্পনা মেপে দেখি।
প্রতিবছর বিসিএস সর্বোচ্চ ২৫০০ থেকে ৩০০০ নিয়োগ হয়। সরকারি ২য় শ্রেণীর অন্যান্য চাকুরি প্রতি বছরে সর্বোচ্চ ৬-৭ হাজার নিয়োগ আসে অানুমানিক। তাহলে, ১ম ও ২য় শ্রেণীর (বিসিএস সহ) অানুমানিক নিয়োগ হবে সর্বোচ্চ ১০-১২ হাজার প্রতিবছর! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ৩য়, ৪র্থ শ্রেণীর চাকুরি অবান্তর ও স্বাভাবিক হিসেবের বাহিরের বিষয়। এইবারে বিসিএস সাড়ে ৪ লাখের মতন পরীক্ষার্থী যা নাকি মালদ্বীপের জনসংখ্যার সমান আর বিসিএস বাদে বাকী ২য় শ্রেণীর চাকুরিতেও সবাই বেশ গাঁ খাটিয়ে মগজ ফাটিয়ে রাত-দিন পড়ছে ও দৌড়াচ্ছে। জব সেক্টরের এমন নাকানি-চুবানি অনিশ্চয়তা সকলেই কম বেশি বুঝে, এখন না বুঝলেও সময় ঠিকই বুঝিয়ে দিবে। উচ্চশিক্ষিতদের সংখ্যা যদি কর্মক্ষেত্রে চেয়ে অধিক গুনে বেড়ে যায়, তাহলে সেটা দেশের উন্নয়ন হয় বটে, তবে তাকে "কর্মহীন উন্নয়ন/বৃদ্ধি(Jobless Development/Growth)" বলে, যা আসলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা(Sustainable Development Goals)এর মধ্যে পড়ে না।
যাক, সেই কথা ২০১৬ এর শেষার্ধের ইউনেস্কোর রিপোর্ট বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৩৩,১৩৯ জন ছাত্র-ছাত্রী বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য যায় স্কোলারশিপে এবং টেবিল থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে প্রতি বছর এই সংখ্যা বাড়ছে । সরকার দেশের শিক্ষিত সমাজকে যথাযোগ্য চাকুরি না দিতে পারলেও, দেশের বিরাট সজাগ একটা অংশ কিন্তু ঠিক সারা বিশ্বে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। তাহলে, আমি, আপনি, আমরা কেনো এখনো ঘুমিয়ে চাকুরির স্বপ্নে ছেঁড়া কাঁথা গায়ে জড়িয়ে!? "আমার বাপ-মা গরীব, আমার সংসার আগে চালাতে হবে চাকুরি দরকার আগে", "প্রিয়তমা পালিয়ে যাবে আমার যদি চাকুরি না হয়"! আরো কত কি? কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে কেউ বলতে পারবে যে আমি অনার্সের সার্টিফিকেট পেয়েই কাঙ্ক্ষিত জব পেয়ে যাবো??? কেউ পারবে না, কারণ সে ভার্সিটিতে ৪-৫ বছর পড়ছে এক ধরণের পড়া আর চাকুরিতে আসবে আরেক ধরণের পড়া, ধরা হলো আমাদের সিস্টেমে! কিন্তু, আপনি আমি কি ভেবে দেখছি, আমি যা পড়েছি তা নিজ দেশে না পাড়লেও বাহিরের দেশে প্রয়োগ করে নিজের ভাগ্য খুলবো? যারা বাহিরের জন্য কোয়ালিটি লেখাপড়া করে তারা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে, যে তারা অনার্স বা মাস্টার শেষ করে বেকার থাকবে না, সারা বিশ্বে ২০০ টার কাছাকাছি দেশ তার জন্য খোলা। যে পরিমাণে বিসিএস পড়তে হয়, তার ২০-৩০% যদি কষ্টটা IELTS & GRE সহ বাহিরে পড়া পড়ে তাহলে জীবনটা এতো অনিশ্চয়তার দিকে ধাক্কা দিতে হতো না।
আর খরচা-পাতির তথ্য না জেনেই ভয় পেয়ে বলে বসি আমি গরীব ঘরের সন্তান! এই যুগে একটা বিয়ে করলে ৫ লাখের কম পায় না বরপক্ষ! আর মেয়েপক্ষে ৭ লাখের বেশি খরচ হয়ে যায় সব মিলে। কিন্তু, বিদেশে লেখাপড়া করার আবেদন করতে সর্বোচ্চ ৬০-৭০ হাজার টাকা লাগে এবং যদি যাওয়ার বিমান টিকিট নিজের পকেট থেকে যায় তাহলে সব মিলিয়ে দেড় লাখ টাকার ঊর্ধ্বে কোন মতেই খরচ করতে হয় না স্বাভাবিক ভাবে। অথচ, একবার বাহিরে যাওয়ার পরে এক থেকে দুই মাসের ভিতরে বাড়িতে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা উপার্জন করে বাড়িতে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব! এই অল্প পরিমাণের টাকা যদি নিজেও কোথা থেকেও ঋণ বা জমি-জায়গা বন্ধক রেখে বা ধার-কর্য বা বৈবাহিক সুত্রেও না যোগার হয়, তাহলে ২০-৩০ হাজার চাকুরির ক্ষেত্রে ৭-১০ লাখ টাকার ঘুষ কোথা থেকে আসে তখন???
আসল কথা হলো সদইচ্ছা থাকলে দুনিয়াটা বিশাল। আর, সুতাকে সাপ ভাবার যে ভয়ার্ত, ঘরকুনো স্বভাব, সেটা যদি মন থেকে দূর করতে না পারি, তাহলে যতই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি না কেন, সব বুঝে শুনে 'হা', 'হুম', 'হ্যা', 'ঠিক' ইত্যাদি বলেই যেই মফিজ সেই মফিজই যদি থাকি তাহলে যতই শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া আর এরশাদ কাকুর উন্নয়ন গাল-গল্প শুনিনা কেন,অতি জনসংখ্যার এই দেশে সর্বদা বড় একটা অংশকে উচ্চমানের বেকার হয়েই থাকতে হবে। কারণ আমাদের কৃষিভিত্তিক প্রথা-গত ধ্যান-ধারণা এখনো কুঁড়ে খাচ্ছে। কুমিল্লা- নোয়াখালীর মূর্খ-অশিক্ষিকদের ঘরের বিদেশী টাকা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আমরা বিদেশে যেতে ভয় পাই কেন? আপনি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও কৃষি ভিত্তিক ধ্যান-ধারণার মতন কোন রিক্স নিতে চাই না, পেশাগত বৈচিত্র্য আনতে ভয় পাই, পিছুটান স্বভাব। ৭-৮ লাখ টাকা ঘুষে চাকুরি খুঁজার জন্য বছরের পর বছর রিক্স নেয়, কিন্তু ১-২ লাখ টাকায় জীবনকে একটা নিশ্চয়তা, সন্মানজনক ও আজীবন নিরাপত্তার দিকে নিয়ে যেতে ভয় পাই।
আমি এসব গান গজল বা গলাবাজি করছি না। আমার পরিবার এক সমময় অার্থিক টানা পড়োনে ছিল যদিও আমার বাবা একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক এবং ৪ ভাই-বোন মিলে মোট ৬ জনের পরিবার। তারপর, জীবন ও স্বপ্ন পাল্টাতে শুরু করলো যখন জমি বন্ধক রেখে পরিবারের বড় ছেলে ও পরবর্তীতের তার স্ত্রী আমেরিকায় দুই বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় গেলো। আমারই পরিবারের হাত ধরে এলাকার অনেক গরীব-কৃষক পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও বিদেশে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখে ও স্বপ্ন বাস্তবায়নও করে। একব্যক্তির স্বপ্ন যেনো আজ সকলের আদর্শগত ও লক্ষ্যগত স্বপ্ন হয়ে গেল।
আমরা আসলে স্বপ্ন দেখতেই ভয় পাই ; 'আমি কি পারবো?', ' আমার দ্বারা কি হবে?' এসব প্রশ্ন নিজেকে দূর্বল করে এসব ভাবা এক প্রকারের পাপ যদি মুসলমান হয়ে থাকেন ; কারণ আল্লাহ কখনোই কোন জাতিকে সহযোগিতা করেন না যখন পর্যন্ত না সে নিজে নিজেকে সহযোগিতা না করে। অর্থাৎ, নিয়তটা আগে ঠিক করতে হবে, নিয়তি আল্লাহর দান।
লেখক পরিচিতি
মো: মেহেদী হাসান
গবেষক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
"বাংলাদেশ ইউনাইটেড স্ট্যুডেন্টস অব ইকোনমিক্স(বিউএসই)"
ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্স এর আয়োজিত ' জাতীয় উদ্যোক্তা অর্থনীতি গবেষণা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০১৮ পুরুস্কার বিজয়ী।
বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষ অধ্যয়নরত।
Email: mehedi7446@gmail.com



Post a Comment