Bangladesh United Students of Economics-BUSE

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

Tuesday, April 7, 2020

মাটি ও মানুষ : করোনা যা শিখিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে

মোঃ মেহেদী হাসান:

বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি দুটা সম্পদ আছে। একটা হলো - পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর মাটি; আরেকটি হলো- সস্তা দরে অধিক পরিশ্রমী শ্রম তথা শ্রমিক। অর্থাৎ উর্বর মাটি ও উর্বর মানব জাতি হল বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি দুটা সম্পদ ।

এই সস্তা দরের শ্রম বাজারের উপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় বড় সেক্টরগুলো গড়ে ওঠেছে, যেমন- তৈরি পোষাকশিল্প তথা RMG অথবা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পুরোটাই সস্তা দরের শ্রমিক নির্ভর রপ্তানি আয়ের উৎস।
এই সস্তা শ্রমের বুকের উপর দাঁড়িয়েই দেশে কোটিপতি শিল্পমালিকেরা তৈরি হয়েছে, জিডিপিও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে ; সরকারও ট্যাক্স-ভ্যাটের ও রপ্তানি আয়ে পেট ফুলিয়ে ক্ষমতা বাড়িয়ে আমলাদের বেতন দফায় দফায় বাড়িয়েছে! শিল্পপতি থেকে সরকার, সরকার থেকে আমলা, আমলা থেকে সরকারি চাকুরীভুক্ত কামলা সবাই সুখী, সবারই লকডাউন মানে বিশাল ছুটি- রীতিমতো ঘরের ভিতরেই হানিমুন!

কিন্তু, যেই সস্তা দরের শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন না দিয়ে শিল্পপতি থেকে সরকার থেকে আমলা থেকে সরকারি বেতনভুক্ত কামলারা ঘরে বসে হানিমুন করছেন, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন? কিভাবে শত শত কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে একজন গার্মেন্টস শ্রমিক লকডাউনের ভিতরে কাজে যোগদান করতে যাচ্ছে, ১-২ দিন কাজে না গেলে চাকুরি থাকবে না তাদের। বাংলাদশের ৮৭% চাকুরি তথা পেশা এমন ইনফরমাল অর্থাৎ যে পেশা বা চাকুরি আজ আছে তো কাল নাই ; দিনে আনে দিনে খায় গোছের, নেই কোন বোনাস-ভাতা। একজন শ্রমিক, একজন দিনমজুর, একজন রিকশাওয়ালা কিভাবে তার সস্তা দরের শ্রমটাও ঠিকমত বিক্রয় করতে পারছে না, এই লকডাউনে! অথচ, তাদের অশিক্ষিত, অভদ্র জাতি বা অসচেতন বাঙালি বলে গালি দেওয়া, লাঠি মেরে, কান ধরে ওঠা-বসা করানো শিল্পপতি, সরকার, আমলা বা সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আপনি আমি আমরাই এতো সচেতন ও মার্জিত! আহা! চোরের মুখে রাম রাম!

যাকগে, এমন বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য আমাদেরই কিছু নোংরা পলিসি দায়ী- অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, সার্ভিস সেক্টরকে নিয়ে অধিকার ব্যবসায়ী মনোভাব এবং সর্বপরি, আমাদের দেশের বড় আশির্বাদ উর্বর জমির কৃষিকে গুরুত্ব না দেওয়া।

করোনা ভাইরাসের আঘাতে সারাবিশ্বে সস্তা দরের শ্রম নির্ভর সেক্টরগুলো সবচেয়ে বেশি আঘাত পাচ্ছে। দেশে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসীরা ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের প্রভাবে দেশে অবস্থিত সস্তা দরের শ্রমিক নির্ভর সকল সেক্টর হুমকির মুখে পড়েছে।

দোষটা প্রবাসীদের নয় বা পেটের টানে পুলিশ-সেনাবাহিনীর লাঠি উপেক্ষা করে কাজে যাওয়া 'অসভ্য' শ্রমিক বা দিনমুজুরদের নয়। দোষটা হলো সরকারের শ্রমিক আইন যথার্থ ভাবে না করা, দোষটা হলো ১-২ দিন কাজে না আসলে চাকুরিচ্যুত করার ক্ষমতা শিল্পকারখানার মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া, দোষটা হলো বেতনকাঠামোর অন্যায্য বন্টনের, দোষটা হলো কৃষিকে অনুন্নত রেখে শহরমুখী মানুষের ঢল নামিয়ে এক অশুভ প্রতিযোগিতা তৈরি করে ন্যায্য বেতনের নিচে বেতন থামিয়ে রাখা, দোষটা হলো পেটে ভাতে শ্রমিক সমাজ গড়ে তোলায়, দোষটা হলো তাদের হাত চললে পেট চলবে এই নীতিতে চলতে বাধ্য করায়, দোষটা হলো হতদরিদ্র শ্রমিক-মজুরদের প্রতিটি পরিবারে একটি করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় যার সাহায্যে যেকোন দুর্যোগে সরাসরি ত্রাণ-তহবিল কোন লুটেরা মধ্যভোগী ছাড়াই পাঠানো যেত। করোনা ভাইরাসের চেয়ে এদেশের বড় ভয়ঙ্কর ভাইরাস হলো দমন, শোষণ ও চরম বৈষম্য সৃষ্টি করার সিস্টেম-টা।

আর, এই সমস্ত দোষ বা ত্রুটি একটি মাত্র ভাইরাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে; বাংলাদেশের অর্থনীতি অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলছে এই একটি মাত্র ভাইরাস! আজ কি আমরা ৮% হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন ভেজে খাবো, নাকি মুড়ি দিয়ে মেখে খাবো- বুঝতে পারছি না।

যাক, এই পরিস্থিতি কাটিয়ে তুলতে হলে, সর্বাগ্রে প্রয়োজন- গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা ; কৃষিজ উৎপাদন ঠিক থাকলে বাকী শিল্পের দোষ-ত্রুটির সমাধান ধীরেধীরে করা সম্ভব।
সবাই তো, পেটের ভয়ে শিল্পপতি নামক হিটলারদের লোলুপ লাভের লোভে এই ভাইরাসের ভয় উপেক্ষা করে তাদের ঘেটো'তে (কলকারখানায়) জীবন দিতে যাবে না। যারা, শহর থেকে গ্রামে এসেছেন, তাদের কিছু অংশের কোয়ারান্টাইন শেষে গ্রামীণ অর্থনীতির মাঝে উন্নয়নমুলক ভূমিকায় অবতীর্ণ করাতে হবে।

আর যারা ভূমিহীন, শহরের হিটলারের ঘেটো ছাড়া উপায় নেই, তাদেরকে অবশ্যই অবশ্যই ফর্মাল চাকুরির আওতাধীন করতে হবে, যেখানে লাইফ সিকিউরিটি, জব সিকিউরিটি, ন্যায্য বেতন বোনাস এবং যথার্থ শ্রমিক আইন করতে হবে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষদের সমন্বয়ে।
ফর্মাল আমলা ও সরকারি চাকুরিজীবিদের বেতন ও সুবিধাদির সাথে সমন্বয় রেখেই শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য টেকসই সুবিধাদি নির্ণয় ও নির্ধারণ করে দিতে হবে।

প্রবাসী যারা রয়েছেন বা দেশে ফিরছেন তাদের সকলের বিনিয়োগ সুবিধা, ঋণ প্রকল্প, প্রবাসে অর্জনকৃত অভিজ্ঞতা মোতাবেক কর্ম করার সুযোগ দিয়ে তথা তাদের সমস্ত পুণর্বাসন প্রক্রিয়া সরকারকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সহযোগিতা করতে হবে। নচেৎ, শুধু ভাইরাস আমদানী নয়, যেকোন অর্থনৈতিক ,সাংস্কৃতিক, ধার্মিক ও দক্ষতা-অভিজ্ঞতার পরিবর্তন আনয়ন প্রবাসীরা করছেন তা যদি যথার্থভাবে চিহ্নিতকরণ না করা যায়, তাহলে ১ কোটি ঊর্ধ্বে প্রবাসী জনগণের যেকোন পজিটিভ বা নেগেটিভ দিক মুল্যায়নের কোন ইন্সিটিউট গড়ে ওঠবে না। ফলে, যে কোন পরিস্থিতিতেই সরকার প্রবাসীদের কন্ট্রোল করতে ব্যর্থ হবে, যেমনটা এইবার হোম-কোয়ারেন্টাইনের নামে সরকারের প্রবাসীদের মাঝে একটা প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্য-বাধকতা মূলক সম্পর্কের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।

পরিশেষে বলব, উপরে উল্লেখিত বিষয়সমূহ যদি যথার্থ আমলে না নেওয়া হয়, তাহলে করোনা ভাইরাসে যত লোক না মারা যাবে, তারচেয়ে অনাহারে-অভাবে ও বেসিক চিকিৎসার অভাবে এদেশে আরো বেশি মানুষ মারা যাবে, যদি এমন লকডাউন অবস্থা আরো দীর্ঘতর হয়। পৃথিবীর শেষ্ঠ উর্বর মাটি ও উর্বর মানব জাতি হয়েও আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি অসহায়বোধ করতে হচ্ছে; কারণ আমাদের আজও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত করে শাসন, দমন, শোষণ ও চরম বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা আমরা বুঝে ওঠতে পারছি না, প্রতিকার তো দূরের কথা!

মোঃ মেহেদী হাসান
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ ইউনাইটেড স্টুডেন্টস অফ ইকোনমিক্স (বিএউএসই)
ইমেইল: mehedi7446@gmail.com
  • 0Blogger Comment
  • Facebook Comment

Post a Comment