Bangladesh United Students of Economics-BUSE

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

We are always ready to work with Govt., NGOs or any social organizations for socioeconomic development in Bangladesh.

Tuesday, July 28, 2020

অবহেলায় উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বঃ রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি প্রসঙ্গে

লেখকঃ জেরিন আক্তার

প্রত্নস্থান বা প্রত্ননির্দশন মানেই হলো ইতিহাস রচনার একটি অন্যতম  মাধ্যম। যার মাধ্যমে তখনকার সমাজের মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ ও আর্থ - সামাজিক সম্পর্কে প্রত্নস্থান সাপেক্ষে একটি সংস্কৃতির বা সভ্যতার পূর্ণগঠন করার প্রয়াস করা হয়।
কিন্তুু আফসোস এর বিষয় আমাদের দেশে প্রত্নতত্ত্ব, প্রত্ননির্দশন বা পুরাকীর্তি শব্দগুলোর অর্থ মানে মোটামুটি  সকলের কাছে  ধারণা হলো প্রাচীনকালের কোন স্থাপনা বা মাটির নিচ হতে খনন করে পাওয়া কোন কাঠামো। 
 

আমাদের দেশে প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে জানার সীমাবদ্ধতা যে রয়েছে তা ক্ষেত্রবিশেষ প্রত্নস্থান ব্যতিত অন্য প্রত্নস্থান গুলির দিকে দৃষ্টি রাখলেই বোঝা যায়। 

জেলার প্রত্ননির্দশন এর তালিকায় নাম থাকলেও প্রত্নস্থানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এর কোন চিহ্ন নেই এমনকি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায়ধীন এর কোন সাইনবোর্ডও নাই।
যার ফলে প্রত্নস্থান গুলির গুরুত্ব সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের কোন ধারণা হচ্ছে না এবং তারা নিজের অজান্তে ইতিহাস এর প্রমাণ গুলো লুট করছে, আগাছার গ্রাসে ও অযত্নে  কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে এসব প্রত্নস্থান গুলি।তেমন ভাবে ঠাকুরগাঁও জেলার প্রত্নস্থানগুলি অবহেলায় ও অযত্নে রয়েছ। 
 
ঠাকুরগাঁও উত্তরবঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা। যা রংপুর বিভাগের অধীন।  জেলাটি টাঙ্গন নদীর তীরে  গড়ে ওঠেছে। 
এ জেলায়ও প্রচীন কাল হতে জনপদ গড়ে ওঠেছে আবার পতনও ঘটেছে। এখনো কিছু প্রত্নস্থান নিরবে তাঁর গৌরবময় ইতিহাস বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যা আমাদের কাছে অজানা।
 তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি। এ অঞ্চলে যে রাজকীয় সংস্কৃতির প্রভাব ছিলো, মুক্ত আকাশের নিচে ধ্বংস প্রায় দেওয়ালগুলো তাঁরই প্রমাণ বহন করছে। এটি ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মালদুয়ার পরগণার ছিলো, যা বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলার ভূক্ত। 
 

অবস্থানঃ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা হতে ৪০ কি.মি দূরে রাণীশংকৈল উপজেলা সদর হতে ১.৩ কি.মি  পূর্বে টাঙ্গন নদীর শাখা কুলিক নদীর তীরে ১০ একর জমির উপর নজরকারা এ রাজবাড়িটি অবস্থিত।

নির্মানঃ উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে রাজা টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথের আমলে কাজ শুরু হয়, তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র টংকনাথ নির্মাণ কাজের সমাপ্তি করে। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ রাজা টংকনাথের পূর্ব পুরুষ কেউ জমিদার ছিলেন না। একটি তামার পাতের দলিল হতে এ তথ্য পাওয়া যা। তা হতে জানা যায় রাণীশংকৈল উপজেলা হতে ৭ কি. মি দূরে কাতিহার নামক স্থানে গোয়ালা জমিদার ভারত বাস করতেন তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।
তিনি কাশি তীর্থযাত্রায় যান এবং ত্রামপাতে উল্লেখ করে যান তিনি যদি ফিরে না আসেন তবে এ জমিদারী লাভ করবে তার মন্দির এর পুজারী। তবে অনেকে মনে করেন এ ঘটনা বুদ্ধিনাথের দু-এক পূর্ব পুরুষের হতে পারে। 
 
বুদ্ধিনাথের ২য় পুত্র টংকনাথ ব্রিটিশ সরকারের আস্থা অর্জন এর জন্য মালদুয়ার গঠন করেন। 
পরবর্তীতে তিনি দিনাজপুরের  মহারাজা গিরিজনাথ রায়ের বশ্যতা স্বীকার করেন। জানা যায় রাজা টংকনাথের স্ত্রী রাণী শংকরী দেবীর নাম অনুসারে এ অঞ্চলটির নাম হয় রাণীশংকৈল।

প্রত্নবস্তু ও রাজবাড়ির বর্ণনাঃ দু-তলা বিশিষ্ট রাজবাড়ির ভবনটি লাল রং এর স্থাপত্যশৈলীতে সজ্জিত। যা ভিক্টোরিয়ান অলঙ্করণের ছাপ, বিশাল ফটক দিয়ে প্রবেশ পথ, রাজবাড়ি সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব কোণে কাছারি বাড়ি, পূর্বে দুইটি পুকুর এবং রাজবাড়ি থেকে ২০০ মিটার দক্ষিণে রামচন্দ্র (জয়কালী) মন্দির অবস্থিত ।
 
 দালান গুলো ইট, চুন সুরকি দিয়ে তৈরী। ইটের উপর  চুন, সুরকির প্রলেপ তার ওপর সাদা রং এর বিভিন্ন টেরাকোটার  নকশা। 
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো বাড়িটি তৈরীতে লোহার রড এর বদলে রেললাইন এর স্লিপার ব্যবহার করা হয়েছে। 
ছাদে প্রথমে ট্যালি তারপর ইট এর গুড়া আবার উপরে ট্যালি ব্যবহার করা হয়েছে।
 
 
 চারপাশে দালান মাঝখানে ফাঁকা অংশটি উঠান । ছাদের সাথে সুরু সিড়ি রয়েছে। 
নিচ তলা হতে উপর তলায় যাওয়ার জন্য স্লিপার এর সিড়িঁ দেখা যায়। সুরঙ্গ পথ ও পাওয়া যায়। বর্তমানে, সরাসরি ছাদের স্লিপার ভগ্ন অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। ধারণা করা যায় যে, যখন এই উপমহাদেশে রেলপথ চালু হয়েছিল, তখন এই ভবনের নকশায় রেলপথের শক্ত স্লিপার লোহা ব্যবহার করা হয়েছিল। আজও, এই ভবনের কাঠামো টিকে থাকার একটি বড় কারণ হল এমন শক্ত লোহার ব্যবহার। সকল ক্ষেত্রেই এমন লোহার ব্যবহার অত্যাধিক লক্ষ্য করা যায়।  ছাদ থেকে সরাসরি পুকুরপাড়ে যেতে ভবনের পেছন দিকে সুরু সিঁড়ি দেখতে পাওয়া যায়। এটি জরুরি বহিরাগমনের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।
ভবনে পাশে একটি কুয়া রয়েছে, যা বর্তমানে অগভীর এবং আগাছাপূর্ণ। পুরো ভবনের চারপাশে সুরক্ষা প্রাচীন দেখতে পাওয়া যায়। 
 ভবনের ভিতরের অংশ আয়তাকার এবং নিচতলা -উপরতলা মিলে প্রতিটি বিল্ডিংয়ে জোড়ায় জোড়ায় সমান্তরাল গোলাকার ফটক/দরজা আছে।
প্রতিটি দেওয়ালে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থাও পরিলক্ষ্য করা যায়,যা সাধারণত মোমবাতি বা চিমনি বাতি বা প্রদীপ শিখার ন্যায় ছোট আকৃতির আলোর ব্যবস্থা করা যায়। 
প্রতিপাশে কম পক্ষে ৩টি করে বিশাল কক্ষ থাকলে আয়তাকার এই দ্বি-তলা ভবনে কমপক্ষে ১৮ থেকে ২০টি কক্ষ চিহ্নিত করা যেতে পারে, যদিও ধ্বংসাবশেস থেকে সব কখগুলো যথাযথ ভাবে হিসেব করা সম্ভব হচ্ছে না। উপরুন্ত, সংরক্ষণের অভাবে উপরের ছাদ , কক্ষের দেওয়াল ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে এবং লতাপাতা, আগাছা ও মানুষের বর্জ্যে নোংরা হয়ে প্রত্ননির্দশন হিসেবে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 
সরকারের ভূমি অফিস প্রত্ননির্দশন এর স্থানটি দখল করে নতুন নতুন ভবন তৈরি করলেও, সরকার কোন ধরণের সংস্কার কাজ আজও দৃশ্যত পরিলক্ষিত হয়নি এই  প্রত্ননির্দশনকে কেন্দ্র করে।
মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত, কিন্তুু এটি দখল করে যেন-তেন ভাবে সংস্কার কাজ করে যাচ্ছে একটি অধুনা ধর্ম প্রচারক হিন্দু সংগঠন, যদিও তারা দাবী করছে মন্দিরের আগের কাঠামো অবিকল রাখা হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা হল,  অধুনা ধর্ম প্রচারক হিন্দু সংগঠনটির ধর্ম বিশ্বাস ও চেতনার সাথে মন্দিরের সূচনা লংগ্নের ধর্ম বিশ্বাস ও চেতনার মাঝের বেশ তফাৎ রয়েছে এবং মন্দিরের প্রত্ননির্দশন বা পুরাকীর্তিগুলোর সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং কি কি জিনিস পাওয়া গেছে , তা পরিষ্কার ভাবে বর্তমান ধর্ম প্রচারক হিন্দু সংগঠনটি বলছে পারছে না। 
মন্দিরের পাশে কুলিক নদীর তীরে ঘাট বাধা সিঁড়ি দেখা যায় । লোক মুখে কথিত এ ঘাটে রাণী শংকরী গোসল করতেন এবং ধারণা করা হয় , এই নদীই ছিল তখনকার পানির প্রধান উৎস। 
 
সময়ঃ তুলনামুলক বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে ধারণা করা হয় ১২০ বছরের কাছাকাছি। 
তুলনামূলক প্রত্ননিদর্শনঃ হরিপুর এর জমিদার বাড়ি। 
পূবর্বতী গবেষণাঃ প্রত্নতাত্ত্বিক গঠনমুলক গবেষণা তথ্য পাওয়া যায়নি। 
    বর্তমান অবস্থাঃ অবহেলিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত 
 
একটি অঞ্চলের অতীত ইতিহাস জানার গুরুত্ব অপরিহার্য। এতে স্বদেশ প্রেম ও অতীত সাপেক্ষে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা যায়, আর এতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে প্রত্নস্থান। আমরা প্রত্নস্থান এর মাধ্যমেই পেতে পারি নতুন ইতিহাস। তাই আমাদের প্রত্নস্থান গুলি জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ প্রয়োজন নতুবা অবহেলায় আমরা আমাদের গৌরবময় ইতিহাস হারিয়ে ফেলতে পারি ।
 
 
লেখক পরিচিতিঃ 
জেরিন আক্তার 
সেশনঃ ২০১৮-১৯ 
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
 
মাঠ পরিদর্শন ও তথ্য-চিত্র সংগ্রহে সহযোগিতায়ঃ 
মোঃ মেহেদী হাসান, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।  শ্রী সুজন অধিকারি, দিনাজপুর সরকারি কলেজ।



 তথ্য সহায়িকাঃ 
ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাস - অজয় কুমার
বণিক বার্তা 
বাংলাদেশ তথ্যবাতায়ন - রাণীশংকৈল উপজেলা
 
 
 

  • 0Blogger Comment
  • Facebook Comment

Post a Comment