তাহলে বলাই যায়, যখন কোন সমাজ ও মানুষের মাঝে অনুভূতির - দামের উদয় হয় তখন তাকে মূল্যবোধ বলে। যেমনটি, গাছের শেকড় এর সাথে ফলের অনুভূতির বিষয়টি। এজন্যই হয়তো মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন মানুষের দান ও প্রাপ্তির জীবন্ত প্রতীক হতে পারে বৃক্ষ।
যখন
এ বোধের উদয় হহয়, তখন মানব সমাজে নৈতিকতার চর্চা বেড়ে যায় এবং বৃহৎ অর্থে
মানুষ সমাজকে, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিকে আপন ভাবতে শুরু করে। যেমনটা
হয়েছিল '৫২ এর ভাষা আন্দোলনে, হয়তো তখনকার মানব সমাজ বাংলা ভাষার আড়াই
হাজার বছরের চলার পথের গল্পকথা ও এর সাথে মিশ্রিত নরগোষ্ঠীর সম্পর্কে অবগত
ছিলো।
তারই ফলস্বরূপ, রাষ্ট্রভাষা বাংলা না মেনে নেওয়াই বুক পেতে দেয় বর্ণমালা খচিত পতাকা হাতে নিয়ে ।
এতেই মূল্যবোধের চরমতর প্রকাশ ঘঠে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এ মূল্যবোধের খুব খারাপ ভাবে অবক্ষয় ঘটছে। যা আমরা আমাদের পড়াশোনার প্রাথমিক পর্যায় হতে শুরু করে কর্মক্ষেত্রের সর্ব জায়গায় ইংরেজির স্থান প্রথমে দিয়ে প্রমাণ করেছি। প্রাথমিক পর্যায়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ইংলিশ মিডিয়াম এ তাদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সূত্রপাত করছে বাংলা ব্যতিত ইংরেজি সংস্কৃতিতে।
এর ফলে, ধর্মবিমুখতাসহ নিজ বস্তুসংস্কৃতি হতে বিচ্যুতি ঘঠছে। আমরা ইংরেজি চর্চার বিরোধী নয়, তবে তা যেন নিজ মাতৃভাষা কে উপেক্ষা করে না হয়। কারণ, নিজ মাতৃভাষায় যেভাবের উদয় হয় তা অন্য ভাষায় প্রকাশ করা দূর্বিষহ্। তাঁর বৃহত্তর উদাহরণ মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্য-জীবন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার জন্য দায়ী নিজ মাতৃভাষায় সৃষ্ট শিক্ষা উপকরণ এর অভাব।
অন্য ভাষা শেখা বা বলা অবশ্যই ভালোগুণ তবে নিজ মাতৃভাষা উপেক্ষা করে নয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ কর্মক্ষম নির্ভর করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজের ২ টিই বেহাল দশা।
আমলাতান্ত্রিক
প্রভুত্ব মনোভাব, ধর্মবিমূখতা, পিতা- মাতাকে অবহেলা, পিতা - মাতা দ্বারা
সন্তানের সঠিক প্রতিপালন এর অমনোযোগ, শ্রেণী বৈষম্য, বেকারত্ব এছাড়াও
চারিদিকে অরাজকতার হাতছানি। এসব হতে মুক্ত হতে হলে সামাজিক মূল্যবোধের উদয় এর প্রয়োজন। কারণ, এসব সামাজিক ব্যধির উৎপত্তিই হয় যখন সমাজ তাঁর নিজস্ব সংস্কৃতির বস্তুগত অবস্তুগত কাঠামো হতে দূরে থাকে। নিজ সংস্কৃতি বোধের মাঝে মিশে থাকে। যখনই অন্য সংস্কৃতির বিকৃত রূপ প্রবেশ করে তখনই জাতীয় চেতনায় ফাটল ধরে। তাইতো - দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ।
আর এই দেশ প্রেম তৈরী ও জাগ্রত করতেই সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়সমুহের পাঠক ও মননশীল গবেষক এর প্রয়োজন। আর
এই পাঠক এর আগ্রহ ও মননশীল গবেষণায় বাস্তবিক উপাদান হলো অতীত মানব সভ্যতার
নির্মাণাধীন ইতিহাসবৃত্তের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যার দেওয়ালের ভাঁজে
ভাঁজে গৌরবময় ও অত্যাচারিত কাহিনী দ্বারা সাবধানতার বাণী ও নিজ দেশ ও জাতির নরতত্বের সংমিশ্রণ এ। নতুবা ধ্বংস অবধারিত। আর এ মূল্যবোধ এর উদয় এর দায়ভার ছাত্র সমাজ ও শিক্ষকদের উপর বেশি অর্পিত এতে সহায়তা করতে বাধ্য শাসক সমাজ। এজন্য প্রমথ চৌধুরী মতে, হাসপাতালে চেয়ে ও লাইব্রেরী বেশি প্রয়োজন। নইলে বঙ্কিমচন্দ্রের মতই বলতে হয়,
"যে জাতি যত বেশি তাঁর অতীত ইতিহাস জানে,
সে জাতি তত বেশি আত্নসচেতন "
বাঙালি জাতির ইতিহাস জানতে হবে, নইলে বাঙালি মানুষ হইবে না।
জেরিন আক্তার
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ

Post a Comment