মোঃ মেহেদী হাসান
বাংলাদেশ বিষয়ে যারা গবেষণা করেন তারা মোটামুটি সকলেই অবহিত যে- বাংলাদেশের রুট বা শিকড়ের দর্শন কি তা এখনও তর্কের বিষয়- অমীমাংসিত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগে পূর্ব বাংলা নব্য মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের ক্ষমতায়ন হয়েছে- দেশভাগ আর যাই করুক- পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজকে ক্ষমতায়িত করছে। সেই সুবাদে বাঙালি সমাজে ইসলামিক করণ প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়া গড়ে ওঠে। কিন্তু, পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের কারণে, শোষণের কারণে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় 'ধর্ম নিরপেক্ষ'করণ প্রক্রিয়া চালু হয় ভারতীয় ও রাশিয়ান শক্তির সমর্থনে ও প্রভাবে। কিন্তু, মহান মুক্তিযুদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে হয়েছিল - ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। তবুও, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতৃক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ১ম সংবিধান এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে- বাঙালি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ - বৈষম্যের বিরুদ্ধেই নয়, বরং ইসলামিকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করে - ধর্ম নিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে রাষ্ট্র তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন করলেও, জনগণের মনসপটে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। ফলে, রাষ্ট্র তার রুট হিসেবে 'ধর্ম নিরপেক্ষকরণ' প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে এবং অধিকাংশ জনগণ ইসলামীকরণকে সমর্থন করে। রাষ্ট্রের ৫০ বছর বয়সে এই সমস্যার ফলাফল কি দাঁড়ালো তাহলে?
এই ৫০ বছরে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যাওয়া বহু সরকার ও ব্যক্তি সংবিধান কাটা-ছেঁড়ার করে, কখনও বিসমিল্লাহ, আল্লাহ এর নাম লাগিয়েছে, কখনও বা বাতিলের জন্য বহু ক্যাম্পেইন করেছে এবং বারংবার 'ধর্ম নিরপেক্ষতা' শব্দটা নিয়ে রাজনৈতিক খেলা হয়েছে। সুতরাং, বলা যায়- সংবিধানে কি রুট বা মূলনীতি হবে সেটা রাষ্ট্র গঠনকারী রাজনৈতিক দলের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে- যে যেমন তার মতন করেই সংবিধান সংশোধন করেছে। সুতরাং, সংবিধান নাম কাগজী পুস্তকের চেয়ে জীবন্ত জনগণ কোনটাকে গুরুত্ব দেয় - সেটাই প্রকৃত গবেষণার বিষয় - জীবন্ত জনগণ কি ধর্ম নিরপেক্ষ জীবন যাপন করে, নাকি ইসলামিক জীবন-দর্শককে গুরুত্ব দেয়?
১৯৪৭ এ যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ হয়েছিল, তার কিছু অংশ এই স্বাধীনতার ৫০ বছরে উচ্চবিত্তে পরিণত হয়েছে; এদের অধিকাংশই মুসলিম হয়েও রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে সমর্থন করে রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করে কোটিপতি, শিল্পপতি, বুদ্ধিজীবী, উপদেষ্টা ইত্যাদি ইত্যাদি বনে গেছে। ১৯৪৭ এর আগে যেমন শোষিত, নিষ্পেষিত নিম্ন মধ্যবিত্তের মুসলিম সমাজ পূর্ব বাংলায় তথা সমস্ত বাংলায় ছিল --- ঠিক তেমনি ভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার সংস্পর্শহীন ইসলামিক ভাবধারায় চলমান একটা নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণী বর্তমান বাংলাদেশে জন্ম নিতে বাধ্য হচ্ছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি তাদের করুণ অবস্থা। এরা কারা?
বাংলাদেশের বড় খাত তৈরি পোশাক খাতে দেখেন- গ্রাম থেকে কর্মের আশায় ঢাকা শহরে এসেছে। মাসে ৮-১২ হাজার টাকা বেতন- গার্মেন্টস এ। সবাই থাকে গুচ্ছ গ্রামে - এক রুমে অনেকজন - ২০-২৫ জনের জন্য একটা বাথরুম। স্বামী-স্ত্রী রাত দিন শিফট করে ডিউটি করে তবুও- থাকা খাওয়ার টান টান ভাব -- আর কয়দিন পর পর রাষ্ট্র ইচ্ছাকৃত ভাবে জিনিসপত্র দাম বাড়িয়ে, সরকারি বেতন বাড়ি এই গরীব মেহনতী মানুষকে একটা চরম উপার্জন বৈষম্যে ফেলে দেয়; গার্মেন্টস মালিকরা সরকারি সমর্থনে লাঠিপেটা করে ন্যায্য মুজুরিও দেয় না ; গ্রামে ফিরে যাওয়ার মতন, কিছু করে খাওয়ার মতন কিছুই জমি-জায়গা নেই, ব্যবসার ক্যাপিটাল নেই। সুতরাং, সরকারের লাঠির সামনে এবং মালিক শ্রেণীর শোষণ বৈষম্যের সামনে আপোষ করতে বাধ্য হয় তারা। শুধু কি গার্মেন্টস কর্মী এই আপোষের শোষণ ও বৈষম্যের শিকার? সারা বাংলাদেশে সকল সেক্টরে এই উপার্জন বৈষম্যের শিকার, সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত; দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকা শক্তি তারা এবং তাই এই উন্নয়নের বলির পাঠা। তাহলে, নীরব বিপ্লবটা কোথায়, কিভাবে হচ্ছে ?
এই শোষিত ও বৈষম্যের শিকার শ্রেণির সন্তানেরা সাধারণ শিক্ষার খরচ জোগাড় করতে পারে না ; ঢাকা শহরের কোন গার্মেন্টস কর্মীর সন্তান নিঃশ্চয় ৪-৫ হাজার টাকায় প্রাইভেট কোচিং করার এবং স্কুল কলেজের খরচের সামর্থ্য রাখে না। হয় তারা ছোট বয়সেই বাদাম, চানাচুর ব্যবসা ধরে এক সময় গার্মেন্টস কর্মী হয়ে বাবা-মায়ের মতন সংসারে হাত ধরে ; নচেৎ খরচ বাঁচিয়ে শিক্ষা নিতে এতীমখানা, হেফজ মাদ্রাসা বা মাদ্রাসা লাইনে লেখাপড়া করে। সমাজের দান দক্ষিণা ও করুনার টাকায় এরা শিক্ষা লাভ করে। বাবা-মা আল্লাহর রাস্তা সন্তান ছেড়ে দেওয়ার পিছনে শুধু সোয়াব লাভের উদ্দেশ্য থাকে না- অর্থনৈতিক অক্ষমতাও বড় মাপকাঠি। এজন্য কোন কোটিপতি, লাখপতির সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় এতিমখানা, মাদ্রাসায় সমাজের দান করুণায় ফেলে আসতে দেখবেন না। ঠিক একই কারণে ঢাকা শহরের ঐসব গার্মেন্টস শিল্প পল্লীর আশেপাশে অনেক মাদ্রাসা মক্তব বা এতিমখানা তৈরি হয়েছে এবং সারা বাংলাদেশেও এ সকল মাদ্রাসা ও এতিমখানার বিস্তার খুব বেশি হচ্ছে। আর, এটা হচ্ছে - বৈষম্য ও শোষণের একটা অসম অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার রেজাল্ট, সামাজিক প্রতিক্রিয়া।কিন্তু, এই বৈষম্য ও শোষণের শিকার শ্রেণীর সন্তানেরাই আবার সমাজে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। কিভাবে?
কিছু বছর আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন 'ধর্ম নিরপেক্ষ'বাদী শিক্ষক বক্তৃতায় তিরস্কার করে বলেছিলেন-, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন উচ্চতর মাদ্রাসায় পরিণত হচ্ছে "। কথাটা বিদ্বেষপূর্ণ হলেও সত্য। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন - আমি যেখানে লেখাপড়া করেছি সেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাসরুমে গিয়ে দেখুন - বোরখা পড়ে ক্লাস করা মেয়ে বহু পাবেন, টুপি পাঞ্জাবি পড়া বহু ছেলে পাবেন। এদের অধিকাংশই হলো- জিএসসি, এসএসসি বা এইচএসসি বা ছোট বেলায় মাদ্রাসা শিক্ষা বা মসজিদ শিক্ষা কেন্দ্রিক ছিল বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রভাবিত।
এ বছর গুচ্ছ পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি তালিকায় ১ম একজন মাদ্রাসার ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল ইউনিটের ১ম অবস্থা মাদ্রাসার ছাত্র, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ১ম মেয়েটার বোরখা পড়া মুখ ঢাকা-সেও মাদ্রাসার ছাত্রী! এগুলো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন সাফল্য নয় ; সারা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখুন ভর্তি পরীক্ষায় কি হারে ঐ সুবিধা বঞ্চিত, শোষিত পরিবারের মাদ্রাসার ভাঙাছেড়া অবস্থায় লেখাপড়া করে আজকে জাতীয় পর্যায়ে মেধায় পরিণত হচ্ছে সমস্ত ক্যাটাগরিতে! শুধু কি তাই? রাস্তায় বের হলে- ১০০ জন সাধারণ নারীর মধ্যে ( স্কুল-কলেজ ও কর্মীদের ড্রেস কোড বাদে) ৮৫-৯০ শতাংশ হিজাব বা বোরখা পড়তে দেখবেন, বাকীগুলো টাকা-পয়সাওলাদের জিন্স,বিউটি পার্লার বা গাড়িওয়ালাদের পোশাক। হাস্য কর মনে হলেও, চলতে বসতে আমাদের চিন্তাশক্তি, অবজারভেশন শক্তি থাকা উচিত- কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া সক্রিয় এবং এর সাথে আর্থসামাজিক সম্পর্কটা কোথায় এবং কিভাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টেলেকচুয়াল লেবেলে শোষিত, বঞ্চিত শ্রেণির উন্থান একটা নীরব বিপ্লবের নামান্তর। বর্তমানে, রাষ্ট্রের 'ধর্ম নিরপেক্ষতা'র চাদরে তলে উজ্জ্বল, তরুণ চামড়া হয়ে গড়ে ওঠছে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া। যারা 'উচ্চতর মাদ্রাসা' বলে তিরস্কার করছে, তারাই বাধ্য হচ্ছে - ঐ 'উচ্চতর মাদ্রাসা'র শিক্ষক হয়ে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার কাছে শিক্ষার ভবিষ্যৎকে সমর্পিত করতে।
ফলে, আজ হয়তো ৫০ বছর পরেও রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দল হয়তো 'ধর্ম নিরপেক্ষতা' আকড়ে শোষণ, বৈষম্যকে অস্বীকার করলেও, স্বাধীনতার ৭০-৭৫ বছরের মাথায় হয়তো এই ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে শোষিত-বঞ্চিতদের উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণী গঠিত হচ্ছে - তারাই হয়তো একটা আমূল পরিবর্তন আনবে --- বিশেষত রাষ্ট্রের মূলনীতি বা রুট সংক্রান্ত পরিবর্তন অনিবার্য ও অবসম্ভাবী।
আর এভাবেই যেখানে শোষণ-বৈষম্যে সৃষ্টি হয়, সেখানেই নীরবে বিপ্লব ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়, হতে বাধ্য।
লেখক পরিচিতিঃ-
মোঃ মেহেদী হাসান
গবেষক ও প্রাবন্ধিক
Post a Comment