দেশের সবচেয়ে দূরত্বতম রেল যোগাযোগব্যবস্থার ইতিহাস ও তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব
মোঃ মেহেদী হাসান
গত ১০ই নভেম্বর নতুন উদ্বোধন করা হল বহুল আলোচিত ৬৩৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া দেশের সবচেয়ে দূরত্বতম রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢাকা-পঞ্চগড় রুট। ঢাকা-দিনাজপুর রুটের দ্রুতযান ও একতা এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনদ্বয় ঠাকুরগাঁও হয়ে শেষপ্রান্তের জেলা পঞ্চগড় পর্যন্ত বাড়ানোর ফলে উক্ত দুই জেলাসহ সমগ্র বাংলাদেশের কি কি অর্থনৈতিক সুফলতা আসবে এটা জানতে হলে বাংলাদেশ তথা এই ভারতীয় উপমহাদেশে রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছুটা পেছনের ইতিহাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
থমাস নিউকোমেন কর্তৃক আবিস্কৃত 'নিউকোমেন স্টিম ইঞ্জিন' এর কার্যক্ষমতা জনিত পরিবর্তন এনে স্কোটিশ ইঞ্জিনিয়ার জেমস ওয়াট ১৭৮১ সালে সর্বপ্রথম 'ওয়াট স্টিম ইঞ্জিন' আবিষ্কার করেন। এই স্টিম ইঞ্জিন'ই ইংল্যাণ্ড তথা ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল। কিন্তু, সময় পরিচক্রে এই আবিস্কারের সুফলতা ছড়িয়ে পড়ে ইংরেজদের অধীনস্থ কলনী ভারতীয় উপমহাদেশে, যার প্রাথমিক লক্ষ্যই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্রিটিশদের কর-পণ্য সংগ্রহ করা অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ট্রেন চলেছিল বম্বে (বর্মানে মুম্বই) থেকে ঠানে, যার কথা প্রথম ভেবেছিলেন বম্বে সরকারের চিফ ইইঞ্জিনিয়ার জর্জ ক্লার্ক ১৮৪৩ সালে ভাণ্ডুপে বসে। সেই ভাবনা থেকেই ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ১৪ কামরার বম্বে-ঠানে রেল চলাচল। এরপর, অর্থনৈতিক কাজের জন্য ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছোট ছোট রেল সেকশন চালু করতে থাকে। এমনি একটি রেল কম্পানি 'ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (ইবিআর)' ১৮৫৭ সালে লণ্ডনে গঠিত হয়। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানী কোলকাতা থেকে রানাঘাট পর্যন্ত ব্রডগেজ (৫ ফুট ৬ ইঞ্চি) রেলপথ সেকশনটিকে ১৮৬২ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর এবং রানাঘাট থেকে দর্শনা হয়ে বাংলার কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ সেকশনটি ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর চালু করে। পরে সেই সেকশনটি গোয়ালন্দ পর্যন্ত চালু হয় ১৮৭১ সালের ১ই জানুয়ারিতে। ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৯ সালে বাংলায় চরম দূর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য সাড়া থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত সেকশনটি চালু করে ইবিআর। পরবর্তীতে, এরই ধারাবাহিতায় পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর এবং পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটারগেজ সেকশনটিও এই কোম্পানি চালু করে। ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে আসে এবং ১ এপ্রিল ১৮৮৭ সালে তা নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ের সাথে একভূত হয়ে যায়। দিনাজপুর জেলা থেকে ঠাকুরগাঁও হয়ে পঞ্চগড় (তৎকালীন ঠাকুরগাঁও মহকুমা) পর্যন্ত মিটারগেজ সেকশনটি চালু হয় ২৮ এপ্রিল ১৯২৮ সালের দিকে (পীরগঞ্জ উপজেলার ভোমরাদহ স্টেশন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে)। ব্রিটিশ আমলে অভিক্তক দিনাজপুর জেলার (ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ ভারতের উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সমূহ) খাজনা আদায়ে এই রেল ব্যবহার করা হতো। তৎকালীন দিনাজপুর জেলায় কর্মসূত্র বহু মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে ওঠে এই দিনাজপুর -পঞ্চগড় রেলওয়ে। বড় বড় সম্পদশালী, সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবার ও ব্রিটিশরা দিনাজপুর জেলাশহরে বসেই পুরো জেলা শাসন করতো এই রেলওয়ের বদৌলতে। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল ব্যাপী বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়ে ছিল যার ফলে মহামারিতে ৩৫ থেকে ৩৮ লক্ষ লোক মারা যায়, সেই দুর্ভিক্ষে তৎকালীন সমস্ত জেলায় চরম অবস্থার অবনতি হয়েছিল ; ২য় বিশ্ব যুদ্ধের যে প্রভাব ভারতবর্ষে অতিরিক্ত খাজনা আদায়সহ বার্মা থেকে আমদানির খাদ্যসমশস্য আসা বন্ধ করায় উত্তরের এই জনপদে লাশের মিছিল বেশ লম্বা হয়েছিল। কিন্তু, শাসন শোষণের এই রেলওয়ে হাতিয়ার যে আবার জনগণের আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে সেটার সাক্ষ্য বহন করে ১৯৪৬ সালের বর্গা বা ভাগ-চাষীদের 'তেভাগা আন্দোলনে'। বৃটিশদের 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' আইনের বিরুদ্ধে 'তেভাগা আন্দোলনে' ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে যে ব্রিটিশ শোষণ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল তা এই দিনাজপুর-পঞ্চগড়ের রেলওয়ের খাজনা ও পাল্টা ব্রিটিশ শোষণ বিরোধী আন্দোলনের যোগাযোগব্যবস্থার বদৌলতে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান উত্তরাধিকার সূত্রে পায় ২,৬০৬.৫৯ কিমি রেললাইন এবং তা 'ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে(ইবিআর)' নামে পরিচিত হয় এবং 'বাংলাদেশ রেলওয়ে বোর্ড' নামে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর উত্তরাধিকারে পায় ২,৮৫৩.৭৩ কিমি রেলপথ ও ৪৬৬টি স্টেশন। এরপর, ৩রা জুন ১৯৮২ সালে রেলওয়ে বোর্ড বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেলওয়ে বিভাগ খোলা হয়। ১২ আগস্ট ১৯৯৫ সালে, ৯ সদস্য বিশিষ্ট 'বাংলাদেশ রেলওয়ে অথরিটি (BRA)' গঠন করা হয় যার দায়িত্ব চলে যায় সরাসরি যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর হাতে। জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে বাংলাদেশে আন্তঃনগর ট্রেন চালু হলেও, ঢাকা থেকে দিনাজপুর আন্তঃনগর ট্রেন চালু হতে সময় নেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি পঞ্চগড় থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত ৯৮২ কোটি টাকা ব্যায়ে ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। ২০১৬ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। গত বছরের ১৭ জুন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক পঞ্চগড় থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত শাটল ট্রেন উদ্বোধন করেন।
কিন্তু, ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ের প্রায় ৩৫ লাখ মানু্ষ শুধুমাত্র শাটল ট্রেনে করে দিনাজপুরে গিয়ে ঢাকার ট্রেন ধরার জন্য এতোটা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেনি! গণদাবী শুরু হয় "শাটল ট্রেন নয়, ঢাকা-পঞ্চগড় সরাসরি ট্রেন চাই"। অবশেষে গত ১০ই নভেম্বর, ২০১৮ তে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় বাসীর এই স্বপ্ন পুরোন হলো।
কিন্তু, ৬৩৯ কিলোমিটারের দেশের সর্ববৃহৎ এই ট্রেন যোগাযোগব্যবস্থার অর্থনৈতিক গুরুত্ব কি? এটা কি শুধুই একটা দূরত্বতম ট্রেন নাকি জাতীয় জীবনে আলাদ কিছু? এসবের উত্তরে আসি এবার।
ব্রিটিশ আমলে যেমন খাজনা, দূর্ভিক্ষের ত্রাণ সহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণ হিসেবে রেল ব্যবস্থার জন্ম হয়েছি সেটাকেই কেন্দ্র করে আবার 'তেভাগা' আন্দোলনের মুক্তিযুদ্ধে রেল লাইন উচ্ছেদ সহ বহু ভূমিকাও রেখেছিল এই রেল যোগাযোগ। ঠিক, স্বাধীনতার পর ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ে তেল সরবারাহ, কৃষিজাত দ্রব্যের আদান-প্রদানে এই রেল লাইনের ভূমিকা জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে মিলিত ভাবে প্রতি বছর প্রায় ৫ থেক ৬ লাখ মে.টন উদ্বৃত্ত অর্থকরী ফসল সারা বাংলাদেশে যায় এবং প্রতিবছর ন্যায্য দামের অভাবে কৃষকরা অনেক ক্ষতি পোহাতে হয়। ঢাকা-পঞ্চগড় সরাসরি ট্রেন ব্যবস্থা বাজার দর সম্পর্কিত তথ্যাদি এবং দামের বৈষম্যতা দূর করতে সহযোগী ভূমিকা পালন করবে। এছাড়াও, বর্তমানের দেশের বৃহৎ রেডিমেড গার্মেন্টস শিল্পে যে শ্রমিক কাজ করে থাকে তার অধিকাংশই উত্তরের কৃষিজনপদের মানুষজন। কৃষিভূমির অতি খণ্ডায়ন, কৃষিব্যতিত অন্যান্য কাজের অভাব, ভূমিহীনতা ও বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার চাপের ফলে প্রায় প্রতিদিন অসংখ্যা মানুষ পাড়ি জমায় ঢাকার গার্মেন্টস শিল্পে এবং অন্যান্য পেশায়। যে মানুষগুলো আজ কৃষি ও তার সংশ্লিষ্ট কর্মচ্যুত তাদের জন্য ঢাকা-পঞ্চগড় অান্তঃনগর ট্রেন একটা নতুন আশার নাম একটা জীবনের সন্ধান। আর জাতীয় অর্থনৈতিক হিসেবে উত্তরবঙ্গের বিশেষত ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় এই জেলার মানুষ অত্যন্ত সস্তা দরে শ্রমজীবী; কারণ ভৌগোলিক ভাবে তারা কৃষিজীবী শ্রমিক বিধায় চাওয়া পাওয়ার হিসেবের চেয়ে কর্ম করে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য তাদের কাছে। ফলে, উত্তরের জনপদের বিশাল অংশ বাংলাদেশের রেডিমেড গার্মেন্টস, প্লাস্টিক, ঔষুধ প্রভৃতি শিল্পে বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে এবং সামনে আরো করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
সুতরাং, এই অর্থে ৬৩৯ কিলোমিটারের দূরত্বতম আন্তঃনগর ট্রেন শুধু নিছক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটির গৌরবদীপ্ত ইতিহাস ও বর্তমান সাক্ষ্য দেয় দূরত্বতম এই রেলপথ বাংলাদেশের একটি যুগান্তকারী শিল্পায়ন বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, দেশের কৃষিপণ্যের দামের ন্যায্যতা ও সাম্যতার একটা অঙ্গ, বেকারত্ব মুছে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করার পথ এই দূরত্বতম রেলপথ।
দেশরত্ন জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যা করেছেন ব্রিটিশ আমলের ১৯২৮ সালের পর থেকে আজ অবধি এমন অবদান আসলেও কেউ করেননি উত্তরের পিছিয়ে পড়া জনপদের জন্য। উত্তরের জনপদ উনার এই অবদান চিরকৃতজ্ঞের সাথে আজীবন এর সুফলতা ভোগ করবেন। ধন্যবাদ জননেত্রী শেখ হাসিনা।
লেখক পরিচিতি
মো: মেহেদী হাসান
গবেষক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
"বাংলাদেশ ইউনাইটেড স্ট্যুডেন্টস অব ইকোনমিক্স(বিউএসই)"
ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্স এর আয়োজিত ' জাতীয় উদ্যোক্তা অর্থনীতি গবেষণা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০১৮ পুরুস্কার বিজয়ী।
বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষ অধ্যয়নরত।
Email: mehedi7446@gmail.com
Tuesday, November 20, 2018
- Home
- Industrial and Labor Economy
- দেশের সবচেয়ে দূরত্বতম রেল যোগাযোগব্যবস্থার ইতিহাস ও তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব


Very Nice Writing Mehedi. :)
ReplyDelete